মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

আজ মিসরীয় রাজার জন্মদিন 

লিভারপুলের ভাগ্য বদলে দেওয়া পথে সালাহ।

ভয়েস নিউজ ডেস্ক:

ভাগ্যবিধাতা যে কখন কোন কারণে কোন ঘটনা ঘটান, তা বোঝা বড় দায়। না হয় স্টিভেন জেরার্ড, ফার্নান্দো তোরেস বা লুইস সুয়ারেজের মতো বাঘা বাঘা তারকারা যা পারেননি, মিসরের অজপাড়াগাঁয়ের এক ছেলে কীভাবে সে অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে যান? আজ আটাশে পা রাখা মোহাম্মদ সালাহের কল্যাণেই তো লিভারপুল দেখছে প্রিমিয়ার লিগের স্বপ্ন!
‘আমার বাবা যদি জানতে পারে যে আজ আমি তোমার সঙ্গে দেখা করেছি, তাহলে সে বড্ড হিংসে করবে!’

পশ্চিম ডার্বির সেন্ট পল ক্যাথোলিক স্কুলে মোহাম্মদ সালাহর থাকার কথা ছিল আধঘন্টার মতো। এমনিতেই ভীষণ নিয়মানুবর্তী জীবনযাপন করতে হয়, চাইলেও তিরিশ মিনিটের একটু বেশি থাকার সুযোগ নেই। আবার লিভারপুলের মেলউডে অনুশীলনও করতে যেতে হবে এর পর।

কিন্তু কীসের কী! সালাহকে খুদে ভক্তরা ছাড়লে তো!

অগত্যা আরও পনেরো মিনিট থাকতে হলো সালাহকে। প্রত্যেকটা ক্লাসরুমে অন্তত একবার করে হলেও দর্শন দিলেন তিনি। আকাশের চাঁদ হাতে পেল যেন আগামী দিনের তারকারা। যাদের মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে আগামীর সালাহ, রবার্তো ফিরমিনো, ভার্জিল ফন ডাইক কিংবা সাদিও মানে!

একদম ওপরের উক্তিটা এমনই এক খুদে গুণমুগ্ধ ভক্তের। শুনে সালাহ একটা আকর্ণবিস্তৃত হাসি দিয়েছেন, এটা না বললেও অনুমান করাই যায়।

লিভারপুলে আসার পর মার্সিসাইডের শহর ও তাঁর আশেপাশের এলাকায় সালাহর প্রভাব এমনই সুদূরপ্রসারী। সালাহর বিনম্র স্বভাবও এখানে সাহায্য করেছে বেশ। দেশের অন্যতম প্রধান ক্লাবের তর্কযোগ্যভাবে সবচেয়ে বড় তারকা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পা এখনো মাটিতে। সুযোগ পেলে এখনো চলে যান মিসরে, নিজের সেই ছোট্ট গ্রামে। অর্থের ঝনঝনানি বা উন্নত জীবনযাপন উন্নাসিক করেনি তাঁকে। নিজের অতীত ভোলেননি সালাহ। প্রিমিয়ার লিগের এত বড় তারকা হওয়ার পরেও সালাহ যেন ঘরের পাশে বাস করা সদাহাস্য সেই প্রতিবেশী, সকালে যার সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণ করা যায় নিঃসংকোচে।

গত সপ্তাহের এক ঘটনা উল্লেখ করা যাক। সেদিন গাড়িতে জ্বালানি ভরার জন্য সেইনসবিউরির এক জ্বালানি স্টেশনে গিয়েছিলেন সালাহ। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, নিজেদের মাঝে সালাহকে পেয়ে উদ্বেলিত সবাই। সালাহও সবার সঙ্গে খোশগল্প করার পাশাপাশি ওই সময়ে স্টেশনে জ্বালানি নেওয়ার জন্য যারা যারা উপস্থিত ছিলেন, সবার বিল পরিশোধ করে দিলেন। এমন বিনয়ী স্বভাব কয়জন ফুটবলারের থাকে?

সাধারণ মানুষের ওপর সালাহর প্রভাব এতটাই বেশি যে, গত বছর তা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিগ্রেশান পলিসি ল্যাবের এক গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত ব্রিটিশদের মধ্যে নাক উঁচু ভাবটা একটু বেশিই থাকে। লিভারপুলের বাসিন্দারাও তার ব্যতিক্রম নন। ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবও তাঁদের মধ্যে প্রবল। অপরাধপ্রবণতাও রয়েছে বেশ। তবে ২০১৭ সালে মোহাম্মদ সালাহ যখন রোমা থেকে লিভারপুলে আসলেন, তখন থেকে ভোজবাজির মতো এই অপরাধ ও ইসলামবিদ্বেষের মাত্রাটা কমে গেল যেন।

এটাই ফুটে উঠেছে গবেষণার ফলাফলে। সালাহ লিভারপুলে আসার পর থেকে প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে ১৮.৯ শতাংশ অপরাধ কমেছে লিভারপুলে। আট হাজার ৬০০ জন লিভারপুল নিবাসীর পূর্বাপর টুইট পর্যালোচনা করে জানা গেছে আরেক অবিশ্বাস্য তথ্য। লিভারপুলের বাসিন্দারা এখন আর মুসলমানদের দিকে ঘৃণাভরে তাকান না, পোস্ট করেন না ইসলামবিদ্বেষী কোনো টুইট। ২০১৭ সালে সালাহ আসার পর লিভারপুলের বাসিন্দাদের ইসলামবিদ্বেষী টুইট দেওয়া কমেছে ৫৩ শতাংশের মতো। ভাবা যায়!

ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, লিভারপুলের মানুষ হয়তো বুঝেছে, সালাহর মতো বিনয়ী ও হাসিখুশি মানুষ যে ধর্ম অনুসরণ করেন, সে ধর্ম খারাপ হয় কী করে! ভালোবেসে তাঁকে দেওয়া ‘ইজিপশিয়ান কিং’ নামটা তাই বাড়াবাড়ি মনে হয় না একদম।

অথচ একটু এদিক-ওদিক হলেই লিভারপুল-সালাহ ; দুজনের পথ চলে যেত দুদিকে।

গ্যারেথ বেলের কথা সবারই জানা। সাউদাম্পটনের শীর্ণকায় এক লেফটব্যাক কীভাবে টটেনহাম হটস্পারে গিয়ে বিশ্বসেরা উইঙ্গারে পরিণত হয়েছেন, এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। একই কাহিনি ঘটেছে সালাহর সঙ্গেও। দুর্দান্ত বাঁ পা থাকার সুবাদে ছোটবেলায় সালাহকে লেফটব্যাক হিসেবে খেলাতেন কোচেরা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই যার গোল করার খায়েশ, গোল আটকানোতে তাঁর মন থাকবে কেন? কায়রোর অনূর্ধ্ব-১৬ লিগের এক ম্যাচে লেফটব্যাকে খেলা সালাহ এত বেশি আক্রমণে উঠে যাচ্ছিলেন যে, গোটা ম্যাচে পাঁচবার প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে একা পেয়ে যান গোল করার জন্য। একটাও গোল করতে পারেননি যদিও।

গোল না করতে পেরে সালাহর সে কি কান্না! কোচ সাঈদ এল-শিশিনির আর কিছু বোঝার বাকী রইলো না। পরের ম্যাচ থেকেই সালাহকে উইংয়ে খেলানো শুরু করলেন এই কোচ। পরের বছর উইঙ্গার হিসেবে প্রিয় শিষ্যের ৩৫ গোল করা দেখে এল-শিশিনি নিজেই নিজের কাঁধ চাপড়ে দিয়েছিলেন কি না, সেটা জানা যায়নি!

সালাহ যদি এখনো লেফটব্যাক থাকতেন, তাঁর কী আর লিভারপুলে আসা হতো?

আল মোকোলুন থেকে সুইজারল্যান্ডের এফসি বাসেল – সালাহর পরের যাত্রাটা বেশ নিরুপদ্রবই ছিল। ঝামেলাটা বাঁধল এর পর। চ্যাম্পিয়নস লিগে চেলসি আর টটেনহামের বিপক্ষে আলো ছড়িয়ে নজর কাড়লেন ইংলিশ ক্লাবগুলোর। তাঁকে পাওয়ার দৌড়ে নেমে পড়ল চেলসি আর লিভারপুল। লিভারপুলের কোচ ব্রেন্ডান রজার্স তখন আক্রমণভাগের শক্তি বাড়ানোর জন্য মরিয়া। সীমিত শক্তি নিয়ে তখন ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে প্রিমিয়ার লিগ পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে লিভারপুল, একজন উইঙ্গার দলে আসলে হালে পানি পান রজার্স। হাতে থাকা রহিম স্টার্লিংরা তখনও অপরিপক্ক, ভিক্টর মোজেসকে দিয়ে কাজ চালানো গেলেও ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তিনি রাখেন না। কিন্তু মাত্র বিশ লাখ পাউন্ডের অভাবে সে জানুয়ারিতে সালাহকে কেনা হয়নি লিভারপুলের। সালাহর পেছনে নব্বই লাখ পাউন্ডের বেশি খরচ করার সামর্থ্য ছিল না দলটার। ওদিকে চেলসির আরও বিশ লাখ পাউন্ড বাড়িয়ে দিতে সমস্যা হয়নি।

ফলে রজার্স নয়, সালাহ পড়লেন হোসে মরিনহোর হাতে।

আক্রমণে সালাহর অতি-আগ্রহই কাল হলো সেখানে। মরিনহো স্বাভাবিকভাবেই সেসব উইঙ্গার পছন্দ করেন, যারা নিজের ঘর সামলে পরে আক্রমণে উঠতে পছন্দ করেন। সালাহ ছিলেন সম্পূর্ণ তার বিপরীত। ফলে ম্যাচের পর ম্যাচ বেঞ্চে কাটাতে লাগলেন সালাহ। ছয়মাস পর ধারে চেলসি থেকে নীরবেই বিদায় নিলেন ‘মিসরীয় মেসি’।

কাটায় কাটায় এক বছর পর যখন ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্টিনায় যোগ দিলেন, সালাহর মনে তখন একটাই লক্ষ্য–মরিনহোর ‘কল্যাণে’ নষ্ট হওয়া এক বছরের ঘাটতি পোষাতে হবে। ফলে দিনশেষে লাভ ফিওরেন্টিনার। সব মিলিয়ে আধা মৌসুমেই নয় গোল করে ফেললেন, হয়ে গেলেন ‘লা ভিওলা’দের নয়নের মণি। কিন্তু সালাহ জানতেন, শিরোপা জিততে হলে ফিওরেন্টিনা যথেষ্ট নয়। পাড়ি জমালেন রোমায়। স্বপ্নের মতো দুই মৌসুম কাটানোর পর আবারও ডাক পেলেন নিজের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য।

ঠিক তিন বছর পর লিভারপুল পেল তাঁদের পছন্দের খেলোয়াড়কে, আর সালাহ পেলেন প্রিমিয়ার লিগে নিজেকে প্রমাণ করার দ্বিতীয় সুযোগ। ফলাফল, সে তো সবার চোখের সামনেই!

গত তিরিশ বছর ধরে স্টিভেন জেরার্ড, ফার্নান্দো তোরেস, লুইস সুয়ারেজ, ফিলিপ কুতিনহোরা যে কাজটা করে দেখাতে পারেননি, সে কাজটা সম্পন্ন করা থেকে আর মাত্র দুই ধাপ দূরে আছেন সালাহরা। তা আর কিছুই নয়, প্রিমিয়ার লিগ জয়। প্রিমিয়ার লিগে আর দুটি ম্যাচ জিতলেই পরম আরাধ্য লিগ ট্রফির দেখা পাবে মার্সিসাইডের লাল দলটা। আগামী বুধবার কোনোভাবে আর্সেনাল যদি ম্যানসিটিকে হারিয়ে দেয়, তবে একটা ম্যাচ জিতলেই চলবে সালাহদের।

আজ এই মিসরীয় তারকার জন্মদিন। তবে জন্মদিনের উদযাপনটা সালাহ আরও অন্তত এক সপ্তাহ পেছাতে চাইলেও লিভারপুলের আপত্তি থাকার কথা না।

একবারে প্রিমিয়ার লিগ জিতেই নাহয় উদযাপনটা করা হবে! সূত্র:প্রথম আলো।

ভয়েস/জেইউ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION